বিচারের নামে কোন পৈশাচিকতা? নূরুল কবিরকে হেনস্তা, লুটপাট এবং ধর্মানুভূতির ধুয়া তুলে যুবককে পুড়িয়ে হত্যা: ইসলাম দেশপ্রেমের চরম লঙ্ঘন।



নিজস্ব প্রতিবেদক 

তারিখ: ২০ ডিসেম্বর ২০২৫

শহীদ শরিফ ওসমান হাদির হত্যার বিচার চাওয়া ছিল একটি ন্যায়সঙ্গত জাতীয় দাবি। কিন্তু গত ৪৮ ঘণ্টায় এই দাবিকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে যা ঘটেছে, তা কোনো সভ্য সমাজের চিত্র হতে পারে না। একদিকে হাদি হত্যার আবেগকে পুঁজি করে চলছে অবাধ লুটপাট, অন্যদিকে ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদ বিরোধী কলমযোদ্ধা নূরুল কবিরের ওপর হামলা। তবে সবকিছুর সীমা ছাড়িয়ে গেছে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে এক হিন্দু যুবককে পিটিয়ে হত্যা, গাছে ঝুলিয়ে রাখা এবং শেষে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার মতো পৈশাচিক ঘটনা।

এই অরাজকতা কি দেশপ্রেম? নাকি ইসলাম রক্ষা? অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র, যেখানে দেখা যাচ্ছেনা এখানে দেশপ্রেম আছে, না আছে ইসলামের ন্যূনতম শিক্ষা।

. ধর্মানুভূতির দোহাই দিয়ে মধ্যযুগীয় বর্বরতা

দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে একটি উগ্রবাদী গোষ্ঠীধর্ম অবমাননা গুজব ছড়িয়ে এক হিন্দু যুবককে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ওই যুবকের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তোলা হয়। কোনো যাচাই-বাছাই বা আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই একদল উন্মত্ত জনতা তাকে ঘর থেকে টেনে হিঁচড়ে বের করে।

প্রথমে তাকে গণপিটুনি দেওয়া হয়। এরপর মৃতপ্রায় দেহটিকে একটি গাছে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। নিষ্ঠুরতার এখানেই শেষ নয়; ঝুলন্ত নিথর দেহে আগুন ধরিয়ে উল্লাস করেছে তথাকথিতধর্মপ্রাণজনতা।



ইসলাম কী বলে?

বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ আলেমদের মতে, এই হত্যাকাণ্ড ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণহারামএবং বড় ধরনের অপরাধ।

আইন হাতে তুলে নেওয়া নিষিদ্ধ: ইসলামে বিচার শাস্তির বিধান একমাত্র রাষ্ট্রের বা বিচারকের (কাজী) কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারে না।

আগুনে পোড়ানো নিষিদ্ধ: হাদিস শরীফে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, "আগুন দিয়ে শাস্তি দেওয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহর।" কোনো মানুষকে (জীবিত বা মৃত) আগুনে পোড়ানো ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

সুতরাং, যারাইসলাম রক্ষা নাম করে এই পৈশাচিকতা চালিয়েছে, তারা মূলত ইসলামের বদনাম করেছে এবং আল্লাহ তাঁর রাসুলের নির্দেশ অমান্য করেছে।

. নূরুল কবিরের ওপর হামলা: বিবেকের অপমৃত্যু

গত ১৭ বছর ধরে যে মানুষটি শেখ হাসিনার স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে নিজের জীবন বাজি রেখে লড়াই করেছেন, সেই নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবিরকে গত দুই দিনে ধানমন্ডিতেআওয়ামী লীগের দালালতকমা দিয়ে হেনস্তা করা হয়েছে।

যারা হামলা করেছে, তারা হয়তো জানেই নাযখন আজকের অনেকবিপ্লবীগর্তে লুকিয়ে ছিলেন, তখন নূরুল কবির টকশোতে এবং লেখনীতে ফ্যাসিবাদের মুখোশ উন্মোচন করেছিলেন। তাকে হেনস্তা করার মাধ্যমে হামলাকারীরা প্রমাণ করেছে, তারা ইতিহাস জানে না, তারা শুধুই অন্ধ আবেগে চালিতমববা দাঙ্গাবাজ।

. হাদি হত্যার আবেগে লুটপাটের উৎসব

হাদি হত্যার বিচারের দাবীতে নামা মিছলগুলোকে ব্যবহার করে একদল দুর্বৃত্ত দোকানপাট ভাঙচুর লুটপাটে মেতেছে।

চিত্র: রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় শোরুমের শাটার ভেঙে মালামাল লুট করা হয়েছে।

অগ্নিসংযোগ: নিরীহ ব্যবসায়ীদের দোকানে আগুন দেওয়া হয়েছে।

প্রশ্ন জাগে, একজন শহীদের বিচার চাইতে গিয়ে আরেকজন গরীবের পেটে লাথি মারা বা তার সম্পদ ধ্বংস করা কি দেশপ্রেম? এটি স্পষ্টতই চুরির মানসিকতা, যা দেশপ্রেমের মুখোশে ঢাকা হয়েছে।

. ‘মব জাস্টিসনাকি দেশকে অকার্যকর করার চক্রান্ত?

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়। নূরুল কবিরের ওপর হামলা, গণমাধ্যমে (প্রথম আলো, ডেইলি স্টার) অগ্নিসংযোগ এবং হিন্দু যুবককে পুড়িয়ে হত্যাসবই এক সুতোয় গাঁথা।

এর উদ্দেশ্য হলো সরকারকে বেকায়দায় ফেলা এবং দেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করা।

হিন্দু যুবক হত্যা করে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

বুদ্ধিজীবীদের ওপর হামলা করে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করা হচ্ছে।

. উপসংহার: এখনই থামতে হবে

আবেগ যখন বিবেকের লাগাম ছিঁড়ে ফেলে, তখন তা আর বিপ্লব থাকে না, তা হয়ে ওঠে সন্ত্রাস। হাদি হত্যার বিচার অবশ্যই হতে হবে। কিন্তু তার নামে লুটপাট, অগ্নিকাণ্ড, নূরুল কবিরের মতো সম্মানিত ব্যক্তিদের অপমান এবং মধ্যযুগীয় কায়দায় মানুষ হত্যাএগুলো কোনোভাবেই কাম্য নয়।

ধর্মের শিক্ষা: ইসলাম শান্তির ধর্ম, নিষ্ঠুরতার নয়। লাশ পোড়ানো বা বিনাবিচারে হত্যা ইসলাম সমর্থন করে না।

দেশপ্রেম: নিজের দেশের সম্পদ ধ্বংস করা বা দেশের মানুষকে হত্যা করা দেশপ্রেম নয়।

সরকার প্রশাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের আকুল আবেদনএইমব রুলবা গণ-অরাজকতা কঠোর হস্তে দমন করুন। প্রকৃত অপরাধীদের (সে হাদির হত্যাকারী হোক, বা যুবককে পুড়িয়ে হত্যাকারী হোক) দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করুন। নতুবা বাংলাদেশ এক অন্ধকার গহ্বরে হারিয়ে যাবে।



প্রতিবেদকের মন্তব্য: একজন মানুষকে গাছে ঝুলিয়ে পুড়িয়ে মারা বা নূরুল কবিরের মতো ব্যক্তিকে অপমান করাএগুলো ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের চেতনা হতে পারে না। এই পৈশাচিকতা এখনই রুখতে হবে।

No comments

Powered by Blogger.