ইতিহাসের পাতায় ‘আপোষহীন’ অধ্যায়; এক মহাজীবনের যবনিকা
নিজস্ব প্রতিবেদক ।
তারিখ: ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে দীর্ঘতম ও সবচেয়ে ঘটনাবহুল অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল আজ। যে নারী একদিন স্বামীর লাশের পাশে দাঁড়িয়ে চোখের জল মুছে হাতে তুলে নিয়েছিলেন দলীয় পতাকা, যিনি স্বৈরাচারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ৯ বছর রাজপথে কাটিয়েছেন, সেই ‘দেশনেত্রী’ বেগম খালেদা জিয়া আজ অনন্তের পথে। ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫, মঙ্গলবার ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি...)।
মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। স্বস্তির খবর হলো, জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের মুহূর্তে তিনি তার শিয়রে পেয়েছিলেন দীর্ঘ ১৭ বছর পর সদ্য দেশে ফেরা জ্যেষ্ঠ সন্তান তারেক রহমানকে।
দেশনেত্রী’ বেগম খালেদা জিয়া জীবনের বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
১. ‘পুতুল’ থেকে জিয়াপত্নী: রাজনীতির বাইরের জীবন
১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট (ভিডিও সূত্র মতে ১৯৪৬ সালে দিনাজপুরে) জন্ম নেওয়া ফর্সা, শান্ত মেয়েটির ডাকনাম ছিল ‘পুতুল’। বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ও মা তৈয়বা মজুমদারের আদরের এই মেয়েটির শৈশব কাটে দিনাজপুর ও বগুড়ায়। ১৯৬০ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তৎকালীন ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিয়ের পর তার নাম হয় খালেদা রহমান।
বিয়ের পর তিনি ছিলেন পুরোদস্তুর গৃহিণী। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বামী জিয়াউর রহমান যখন রণাঙ্গনে, তখন দুই শিশুপুত্র তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোসহ তিনি ঢাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে বন্দি ছিলেন। ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি মুক্ত হন। জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরও খালেদা জিয়া নিজেকে প্রটোকলের আড়ালে নিভৃত রাখতেই পছন্দ করতেন।
২. ধংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখি: রাজনীতিতে অভিষেক
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হলে খালেদা জিয়ার সাজানো বাগান তছনছ হয়ে যায়। দুই এতিম সন্তান আর স্বামীর হাতে গড়া দল বিএনপির ভবিষ্যৎ যখন সংকটে, তখন দলের কর্মীদের কান্না আর অনুরোধে ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ গ্রহণ করেন।
গৃহবধূর শাড়ি ছেড়ে তিনি পরেন সুতি শাড়ি, চোখে ওঠে চশমা। ১৯৮৩ সালে তিনি দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালে চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
৩. আপোষহীন সংগ্রাম ও স্বৈরাচার পতন (১৯৮২-১৯৯০)
১৯৮২ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখল করলে শুরু হয় খালেদা জিয়ার আসল পরীক্ষা। ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০—এই সাত বছর তিনি রাজপথে ছিলেন অবিচল। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, পুলিশের লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল এবং বারবার গৃহবন্দিত্ব তাকে দমাতে পারেনি। এরশাদের পাতানো নির্বাচন তিনি বারবার বর্জন করেছেন। তার সেই বিখ্যাত উক্তি, "স্বৈরাচারের পতন না হওয়া পর্যন্ত আমি ঘরে ফিরব না"—তাকে এনে দেয় ‘আপোষহীন নেত্রী’র উপাধি। অবশেষে ৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে এরশাদের পতন ঘটে।
৪. সংসদীয় গণতন্ত্র ও প্রধানমন্ত্রীত্ব
১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। তার হাত ধরেই দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তিত হয়। তার শাসনামলের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো ছিল:
নারী শিক্ষা: গ্রামীণ মেয়েদের জন্য অবৈতনিক শিক্ষা ও উপবৃত্তি চালু করা।
অর্থনীতি: ভ্যাট প্রবর্তন এবং মুক্তবাজার অর্থনীতির বিকাশ।
১৯৯৬ ও ২০০১: ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬-এর নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে যুক্ত করেন। পরবর্তীতে ২০০১ সালে চারদলীয় জোটের নেতৃত্বে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০৫ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিন তাকে বিশ্বের ১০০ প্রভাবশালী নারীর তালিকায় স্থান দেয়।
৫. ১/১১ এবং মাইনাস টু ফর্মুলা
২০০৭ সালের সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সে সময় তাকে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার ‘মাইনাস টু’ ষড়যন্ত্র চলে। কিন্তু তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেছিলেন, "দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই। এই দেশ, এই দেশের মাটি ও মানুষই আমার সবকিছু।" তার এই অনড় অবস্থানের কারণে ষড়যন্ত্রকারীরা পিছু হটতে বাধ্য হয়।
৬. বাড়ি উচ্ছেদ, কোকোর মৃত্যু ও মানবিক ট্র্যাজেডি
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০১০ সালে তাকে তার দীর্ঘ ৪০ বছরের স্মৃতিবিজড়িত মইনুল রোডের বাড়ি থেকে এক কাপড়ে উচ্ছেদ করা হয়। এরপর তিনি গুলশানের ‘ফিরোজা’ বাসভবনে ওঠেন।
সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে ২০১৫ সালে। টানা ৯৩ দিন গুলশান কার্যালয়ে অবরুদ্ধ থাকাকালে মালয়েশিয়ায় মারা যান তার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো। মা হয়ে সন্তানের শেষ যাত্রায় পাশে থাকতে পারেননি, কার্যালয়ে বসেই ছেলের নিথর দেহ দেখতে হয়েছিল তাকে। সেই দৃশ্য দেখে কেঁদেছিল গোটা বাংলাদেশ।
৭. কারাবাস, অসুস্থতা ও নিঃসঙ্গতা (২০১৮-২০২৪)
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় তাকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় (পরে বেড়ে ১০ বছর)। নাজিমউদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের স্যাঁতসেঁতে কক্ষে তিনি ছিলেন একমাত্র বন্দি। সাথে ছিলেন কেবল পরিচারিকা ফাতেমা। সেখানে থাকাকালীন তার লিভার সিরোসিস, হার্ট ও কিডনির জটিলতা মারাত্মক আকার ধারণ করে।
২০২০ সালে করোনার সময় নির্বাহী আদেশে বাসায় থাকার অনুমতি পেলেও তিনি ছিলেন কার্যত গৃহবন্দি। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে যেতে দেওয়া হয়নি।
৮. শেষ অধ্যায়: বিজয় ও বিদায়
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর তিনি পুরোপুরি মুক্তি পান। কিন্তু ততদিনে তার শরীর ভেঙে পড়েছে। লন্ডনে নেওয়ার প্রস্তুতি থাকলেও শারীরিক অবস্থার কারণে তা সম্ভব হয়নি।
অবশেষে গত ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫, তারেক রহমান দেশে ফিরলে মা-ছেলের দীর্ঘ ১৭ বছরের বিচ্ছেদ ঘোচে। হাসপাতালের বেডে শুয়ে প্রিয় সন্তানের হাত ধরেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।
উপসংহার
বেগম খালেদা জিয়া কেবল একটি দলের প্রধান ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের গণতন্ত্রের মানসকন্যা। তার মৃত্যুতে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি হলো। ইতিহাস তাকে মনে রাখবে এমন এক নেতা হিসেবে, যিনি ক্ষমতার চেয়ে দেশ ও জনগণকে সর্বদা ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছেন।

No comments